অনাবিষ্কৃত ভারতবর্ষ : প্রথম পর্ব – মশানজোর, ঝাড়খন্ড

অনাবিষ্কৃত ভারতবর্ষ : প্রথম পর্ব – মশানজোর, ঝাড়খন্ড

অনাবিষ্কৃত ভারতবর্ষ : প্রথম পর্ব – মশানজোর, ঝাড়খন্ড 1024 601 সীমানা ছাড়িয়ে

গন্তব্য খুব দূরে বা একবারই মাত্র আসব, এমন না হলে আমি সাধারণত যাওয়ার আগে মোবাইল বা ল্যাপটপ খুলে অনেক পড়াশোনা করি না। হয় ট্রাভেল এজেন্টের ওপর তল্পিতল্পা জমা করে দিই, নাহলে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিই। এতে কোন জায়গার সব দর্শনীয় স্থান কখনই আমার দেখা হয় না, তবে যেগুলি আমার ভাল মনে হয়, সেগুলি অবশ্যই দেখি। আমায় গিয়ে কোন এক জায়গার সেরা হোটেলে উঠতেই হবে, এমন কোন বাধ্যতাও নেই। তৎস্বত্ত্বেও আমার কোন ভ্রমণ নিয়ে বিলাপও নেই। আমার মনে হয় আগে বেশি না জেনে, যদি গিয়ে ঘুরে ঘুরে চিনি একটি জায়গা সেটা দেখা হয়। না হলে তো অন্য কেউ দেখাচ্ছে। যিনি দেখাবেন তাঁর একটি তালিকা সবসময় আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ালে, বেড়াতে আসাটাও একটা কাজ হয়ে যায়। তার চেয়ে পকেটে হাত দিয়ে অচেনা শহুরে পথ, পাহাড়ের অলি-গলি, বন-জঙ্গল, অচেনা রিক্সা বা অটোওয়ালার সাথে গল্প করতে করতে নেমে গিয়ে পথের পাশে অচেনা দোকানের কাবাব বা জিলিপি টেস্ট করতে, অথবা ভাল লেগে যাওয়া কোন পাথরে বসে সন্ধে নামতে দেখতে বেশি ভাল লাগে। সব সম্পর্কের যেমন নাম হয়না, তেমন সব সুন্দর জায়গার নাম সানসেট পয়েন্ট হয়না। যারা এভাবে বেড়াতে রাজি তাদের ঝাড়খন্ড বারবার ভাল লাগবে। তবে প্রাক্তন সাঁওতাল পরগনা সবার পেয়ালা নয়। রাতে নাইট ক্লাবের চোখ ঝলসানো লেজার আলো নেই, তার বদলে রাতের তারাভরা আকাশ। সব চেয়ে স্বস্তিদায়ক বিষয়টাই হল আপনার পেছনে একজন গাড়িচালক, হোটেলের দালাল, পান্ডা বা গাইডও আসবে না। এদের বাদ দিয়ে পর্যটনস্থল আজকাল আর হয় কই।

 

দূরত্ব সিউড়ি থেকে রওয়ানা দেওয়ার একটু পরেই হারিয়ে গেলাম শালেবনের জাদুতে। ঝাড়খণ্ডের যে অংশ দিয়ে রাস্তা গেছে তা আগে বাংলার অংশ ছিল, দুমকা জেলা। ঘনঘন বাড়ির মালিকের বা দোকানদারের বাঙালি নামেও তা বোঝা যায়।

পুরো পথেই আপনার সঙ্গী হবে অমসৃন রাস্তা, প্রায় ঊষর মাটি, শিমূল-পলাশ-শাল-মহুয়ার জঙ্গল আর বসন্তে গেলে মনে হবে যেন গাছের ডালে ডালে আগুন লেগেছে। আমার মায়েরা এদিকে ওঁদের ছেলেবেলায় অনেক আসতেন, মামা বলছিলেন “প্রায় বছর চল্লিশ আগের ঘন জঙ্গল আর নেই। বহু আগে একদিন নাকি মশানজোরের আশপাশের জঙ্গল থেকে বাঘ এসে ওই রাস্তাতেই বসেছিল। সেসময় আমার শোনা ও আমার নিকট আত্মীয়ের প্রত্যক্ষ দর্শনের ঘটনা। কৃষ্ণনগর বা কোলকাতা থেকে দুমকা যেতে সন্ধে গড়িয়ে যেত, ওই রাস্তায় যেতে ভয়ই করত। তবে ফিরতি পথে ভোরবেলায় উঁচু মালভূমি বা ছোটো ছোটো পাহাড় আর দিগন্ত বিস্তৃত উঁচু নিচু প্রান্তর থেকে সূর্যোদয় দেখা ভুলতে পারিনা।”

যেতে যেতে দেখছি পথঘাট। প্রথম কালবৈশাখী ওঠেনি, কয়েকটি গাছের তলায় ঝরা ফুলে লাল হয়ে আছে। আর দেখতে পাবেন কিছু আদিবাসীদের দৃষ্টিনন্দন কুটির। দূরত্ব মাত্র তিরিশ কিলোমিটার, রাস্তা হুট করে শেষ হয়ে গেল।

মশানজোর একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা কানাডা’র সহায়তায় উনিশশো পঞ্চাশে গড়ে ওঠে ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর। উচ্চতায় দেড়শো ফুট, দৈর্ঘ্যে প্রায় বাইশশো ফুট, লকগেট আছে একুশটি। এই জলাধারটি নির্মাণের পর বেড়ানোর জায়গা হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। ঘন নীল জল ঘিরে ছোটনাগপুর মালভূমির অজস্র টিলা, চারিদিকে পলাশ-কৃষ্ণচূড়ার সমাহার আর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি মিলে এক অদ্ভুত বাতাবরন তৈরি করে। আশপাশে দোকানপাট খুব কম। বাঁধের নীচে নেমে গেলে দেখবেন অজস্র পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে ময়ূরাক্ষী। দু’পারে ভর্তি পলাশ, শিমূল আর শাল। এখানে স্রোত, পাখির ডাক আর বাতাসে পাতার ‘সরসর’ করে আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা যায় না।

মশানজোর শান্তিনিকেতন থেকে মাত্র আটচল্লিশ কিলোমিটার দূরে, তাই শান্তিনিকেতন ঘুরতে এসেও মশানজোর ঘুরে যাওয়া যেতে পারে। কলকাতা থেকেও ডে টুর করে নেওয়া যায়, রাস্তা ভাল থাকলে যেতে ঘন্টা ছয়েক লাগে। তবে জায়গাটি এতই সুন্দর যে কম করে একদিন-একরাত থেকে যাওয়াই উচিত। শহরের ব্যস্ত জীবনে কেউ বিরক্ত হয়ে পড়লে নিজের সঙ্গে কথা বলার জন্য বা স্কুলের বন্ধুরা একত্রে অনেকদিন পর একটি weekend একসাথে থাকতে চাইলে হয়ত এটাই সেরা গন্তব্য। থাকার ব্যবস্থা আছে ময়ূরাক্ষী ভবনে ও ইয়ুথ হোস্টেলে। বুকিং করতে হয় কলকাতা থেকেই। যোগাযোগ-

১) Mayurakshi Bhavan Booking- Deputy Secretary, Irrigation Department, Water Resource Development Building,
Salt Lake City, Kolkata – 700091.

২) Youth Hostel- Yuva Kalyan Office, 32/1 BBD Bag (South), Kolkata – 700001

Leave a Reply

Solve : *
30 ⁄ 15 =