‘আমফান ঝড়’- যারা এর পরেও বেঁচে ছিল

‘আমফান ঝড়’- যারা এর পরেও বেঁচে ছিল

‘আমফান ঝড়’- যারা এর পরেও বেঁচে ছিল 1024 734 সীমানা ছাড়িয়ে

ভারতে কি কেউ মনে করতে পারেন ক্রিশ্চিয়ান(https://biographyinsider.com/christian-kroll/ )ক্রোলকে? না প্রফেসর শঙ্কুর বন্ধু ইউলহেলম ক্রোল নন, তবে ইনিও জার্মানির বার্লিনের লোক। তে্রো বছর আগেই ভারত, নেপাল ঘুরে গেছেন। ওঁর সার্চ ইঞ্জিন ‘ইকোশিয়া’ লভ্যাংশ থেকে প্রতি  ০.৭৫ সেকেন্ডে একটি চারা রোপন করে!  জনসংখ্যাবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হারে কমছে গাছ, মানবসৃষ্ট এক mass extinction আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই তাদের এমন উদ্যোগ, এ বছরেও লভ্যাংশের অনেকটা তারা দান করেছে ব্রজিলের রেইনফরেস্ট পুনর্গঠনে।আমাজনের আগুনের রেশ কাটার আগেই, এবারের শেষ গ্রীষ্মে “আমফান ঝড়” বা “উম্পুন ঝড়” তান্ডবে কলকাতা শহরে পড়ে থাকা পাঁচ হাজার গাছ দাঁড় করিয়ে দিল অনেক প্রশ্নের সামনে। কিছু হেলে যাওয়া গাছ সরকারি উদ্যোগে আবার প্রতিস্থাপন হয়েছে, তাদের অনেকে বেঁচেও গেছে। অনেকে নিজস্ব উদ্যোগে গাছের কাটা ডালে ওষুধ দিয়ে প্লাস্টিক বেঁধে দিলেন, তাতে কিছু ডালপালা গজিয়েও উঠল। মানে মানুষ মন দিয়ে চেষ্টা করলেই, পরিবেশের জন্য অনেক বেশি করতে পারে গাছপালা নিয়ে একেবারেই কিছু জানি না, তবে ‘আমফান ঝড়ে‘র পর শিখলাম গাছ অনেক কম resource নিয়েই বেঁচে থাকে।  যেখানে গাছ মানুষের ঘরবাড়ির ক্ষতি করেছে সেখানে গাছকে রেয়াত করা হয়নি। একটি গাছকে মারতে গেলে অনেক মানুষকে তার মৃত্যু পরোয়ানায় সই করতে হয়। অনেক দূরদর্শীকে অন্ধ হতে হয়, বুদ্ধিমানকে বোকা হতে হয়। ঘুরতে ঘুরতে কিছু প্রশ্ন এল মনে, জবাব খোঁজার চেষ্টা করলাম।

প্রথম প্রশ্নটা সহজ, তা হল তাহলে কি বাড়ির আশপাশে গাছ লাগাব না? উত্তর একটি এলাকাবাসী কুড়ি বছর আগে নঞর্থক ভাবে দিয়েছেন। রাস্তার ধারে লাগানো হল গাছ অরণ্য সপ্তাহে, রাতের অন্ধকারে বেশ কিছু গৃহকর্তা গাছটি উৎপাটন করলেন। ছিল সরকারি জমিতে, কিন্ত বাড়ির পক্ষে বিপজ্জনক। বাকি কিছু বড় হল। বড় হতেই তাদের মাথার ওপর চলে এল বিদ্যুতের লাইন, তাই কেটে ফেলা হল। গত বছর শেষ বৃক্ষটির ও আমার “সর্বনাশের আশা” শেষ হয়েছে। কাজেই গাছ আপনি যেখানেই লাগান উন্নয়ন এসে তার মূলোৎপাটন করবেই। তবে সব এলাকাবাসী এমন হয়না, সব জায়গাতেই গাছের ওপর লাইন যায়না আবার আমারই মতন সবার একটি চারাগাছকে বড় করার স্বপ্ন সফলও হয়না। তাই গাছ লাগানোর সময় মন খুব শক্ত হতে হবে। যদি না পারেন আপনার সামনে রইল বেঁচে থাকা গাছগুলিকে বাঁচানোর চেষ্টা করার রাস্তা।

এবার’ আমফান ঝড়ে’র পর দ্বিতীয় প্রশ্ন, পড়ে যাওয়া গাছ তোলার প্রয়াস কতটা প্রাসঙ্গিক, তাতে কি কাজের কাজ হয়? নিচের ছবিটি দেখুন। স্থানঃ কৃষ্ণনগর।

উপরের ছবিতে একটি বাড়ির গাছ ঝড়ে পড়ে যায় প্রাচীর সমেত এবং ইলেকট্রিক লাইনে বিপজ্জনক ভাবে ঝুলতে থাকে। ইলেকট্রিক বোর্ড আজকাল পরিণত হয়েছে বলেই হোক বা কাজ কমানোর জন্যই হোক, ওঁরা পুরো গাছ না কেটে গাছের অগ্রভাগ কেটে দিয়ে যান।

 

পরের ছবিটি দেখুন, দুই বন্ধুর সুপরামর্শে ও সাহসে আমফান ঝড়ের পর গৃহকর্তা গাছটি তিনদিকে টান দিয়ে সোজা করেছেন। কাজটি করার আগে গাছটি আরেকটু কাটা হয়েছে যাতে দুর্বল শিকড়ে বড় গুঁড়ির চাপ কম পড়ে।

উপরের ছবিতে গাছটিকে টানা দিয়ে রাখার সঙ্গেই নীচ থেকে দুটি বাঁশের খুঁটি দিয়ে support রাখতে অনুরোধ করেছে আটজন শ্রমিক(দু’জন ছিল পরিযায়ী)। তারপর কাটা গুঁড়িতে ও শিকড়ে growth hormone দিয়ে ওর কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।

 

এই সিরিজের শেষ ছবিটি নীচে।

এতে কিন্ত দেখা গেল একমাস পলাশ(https://bit.ly/পলাশ) গাছ কথা বলতে শুরু করেছে। ও কতটা শিকড়ে জোর পাবে, দড়ি বা বাঁশের সাপোর্ট কতটা স্থায়িত্ব দেবে তা বলবে ভবিষ্যৎ। আপাতত কিছুদিন সবুজ ডালপালা বাড়ুক। আমি দ্বিতীয় প্রশ্নের মোটামুটি দু’টি ভাল রেজাল্ট পেয়ে স্বস্তি খুঁজে নিলাম, গাছও মানুষের সহাবস্থানে নিরাপদ আর গৃহকর্তা সৎসঙ্গেই আছেন। আরো উদাহরণ অবশ্য আছে ভাল ঘটনার, যেমন – যশোর রোড চওড়া করার সময় গাছগুলিকে না কেটেই রাস্তা করা যেতে পারে বলে মত দেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয় মানুষেরা। তারা এই কয়েক হাজার গাছকে ঐতিহ্যশালী তকমা দেওয়ারও দাবী জানিয়েছেন।

 

তৃতীয় প্রশ্নটি গোলমেলে -‘ আমফান ঝড়ে’র পর হেলে যাওয়া গাছের কি মানুষের সাহায্য ছাড়া কোনোই গতি নেই? এর উত্তর খুঁজতে বেরোলাম কলকাতার পথেঘাটে। অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে যথারীতি কিছু ছবির আশ্রয় নিচ্ছি। নীচের ছবিতে এ এক আত্মনির্ভর বৃক্ষ।

উপরের ছবিটিতে দেখুন মাটি থেকে চারহাত ওপরে মোটা গুঁড়ি কাটতে হয়েছিল, এই গাছটিও অনেকটাই হেলে গেছে। তবে সবুজের সমারোহেই সে নতুন জীবনে ফিরছে। পুনর্জীবনে কোন মানুষ তেমন অবদান রাখেও নি, তাতে ওর খুব একটা অনুযোগও নেই।

 

এই গাছের নাম দিয়েছি- “উঠে দাঁড়ালেন অরুন মিত্র”, পরের ছবির আমফান ঝড়ে ধরাশায়ী গাছ।

এই ধরাশায়ী গাছ দুটির কিন্ত, বর্ষার পর মনে হচ্ছে বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম। যদিও আমি খুবই কাঁচা এই বিষয়ে তাও দেখে মনে হল। তবে পরে ফিরে এসে অবশ্যই দেখব কি হল এদের। আপাতত মৃত্যুর সম্ভাবনা ফুঁৎকারে উড়িয়ে অমিতবিক্রমে ডালপালা মেলছে সে। বাঁচুক নয় সে মাত্র আর তিন মাস, কিন্ত বাঁচতে জানে। তাকে দেখে আমি আর কি বলব, সুমনের বিখ্যাত গান “নতুন একটা কবিতা পড়তে উঠে দাঁড়ালেন অরুন মিত্র” থেকে এক কলি মনে পড়ে গেল –

উঠে দাঁড়ালেন যেমন দাঁড়ায় /পুরানো মাটিতে গাছের চারা /সে উত্থান দেখে নেয় শুধু /মহাজীবনের সঙ্গী যারা।

এর নাম দিয়েছি “সংশপ্তক”। আমফান ঝড়ের পর আরেকটু খারাপ অবস্থায় থাকা কিছু গাছের একটিকে দেখে নিই। যেমন দেখুন নীচের গাছটিকে।

এর যাকে বলে আগা-গোড়া কিছুই নেই। ঝড়-জল দুয়ে মিলে জীবনীশক্তি শেষ করে ফেলেছে প্রায়, তাও একটি ডাল সম্বল করে সালোকসংশ্লেষ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

এর নাম দিইনি, তবে ডালটির নাম দিয়েছি “ফিনিক্স”। এবার দেখি শেষ ছবিটি।

কয়েকদিন ধরে দেখছি, এভাবেই পড়ে আছে আর গুঁড়িটা মাঝখান থেকে কাটা। গাছটি অশ্বথ। হয়ত এটি জ্বালানির কাজে লাগবে, অথবা প্লাইউড। এই অবধি ভেবে ফিরে দাঁড়ালাম, আমার ছেলেবেলায় আমরা এমন সময়ে ডালপালা তুলে ঝুলন সাজাতাম। আশপাশে কোন বাড়ির ঝুলনে একে যদি কেউ ডালটা নিয়ে যায়! আর নেহাতই যদি জ্বালানি ও প্লাইউড, এই দুটোই যদি চয়েস থাকে তাহলে গুঁড়িটা জ্বালানিই হোক। যারা গাছ কেটে ব্যবসা করছে তাদেরই বসার ঘরের ফার্নিচার হওয়ার চেয়ে গরীবের উনুনে ইন্ধন হওয়া ভাল।

কিছু গাছ যেমন অর্জুন, শিশু, নিম, আম ও জাম কিন্ত খুব একটা পড়ে থাকতে দেখলাম না। এগুলি সবুজায়নের জন্য এসব গাছ ভাবা যেতেই পারে। গাছগুলির গোড়া ছিল বাঁধানো, শহরের বুকে কয়েক দশক ধরে চলেছে মাটি খোঁড়া। কখনও মেট্রো, কখনও কেবেল লাইন বা মোবাইল কোম্পানি, কখনও জলের পাইপ, কখনও শুধুই উন্নয়ন হচ্ছে বলে ফুটপাথের টাইলস বদলানো হচ্ছে বছরে দু’বার। আর ছিল অবৈজ্ঞানিক ও অপরিকল্পিত ভাবে শহরের রাস্তার ধারে মটকা গাছ লাগানো। সেই সব গাছ নয়নাভিরাম আবার দ্রুত বাড়লেও কঠিন শিকড়ের গাছ নয়। একে তো বিস্তর খোঁড়াখুঁড়ির জন্য শহরের মাটিটাই আলগা হয়ে গিয়েছে, তারপর নরম শিকড় আমফান ঝড়ের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। প্রকৃতির সঙ্গে হাত ধরে চলাটা আমাদের রপ্ত না করলেই নয়।

ঝড়ঝঞ্ঝা আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আমরা আসার আগেও ছিল পরেও থাকবে। আমরা কুখ্যাত আড়াইশো কিলোমিটারের Hurricane দেখি নি। রাজ্যে জমিও কম – তাই গাছগুলি বড় হয় বাড়ির পাশে, তাতে কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়। Hurricane দূরস্থান, cycloneএই আমাদের “হাতে হেরিকেন”। আমাদের রাজ্যে মনে হয় ভূগোল ইতিহাসকে ক্রমাগত হারিয়েই যাচ্ছে, কারণ মানুষ শিখছেন না। এইটা বলেই মনে পড়্‌ল হিমাচলের এক ছোট শহরে এক বাঙালি প্রৌঢ়ার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তিনি প্রবাসী, বাগানে দেখি টবে টগর গাছ। অবাক হয়ে দেখছিলাম বলেই আলাপটা হয়েছিল। বাবার লাগানো গাছের চারা, বাড়ির গাছ থেকে বানিয়ে এনে, সযত্নে টবে লালন করছেন। সীমিত বিদ্যে বলছে টগর হিমাচলে হওয়ার কথা নয়। এখানে ওঁর সেই নিষ্ঠার কাছে গাছটির ইতিহাস ও আবেগ কিন্ত ভূগোলকে হার মানাল।  কেন যেন মনে হয় এই খুনসুটি নিয়েও একদিন অসীম বিন্দুতে গিয়ে ইতিহাস আর ভূগোল হাত ধরাধরি করে নেবে। বিগ ব্যাংয়ের আগেও ওরা একই ছিল- বিজ্ঞান, ভুগোল আর ইতিহাস এই তিন বিষয়। সেই অসীম কাল আগে থেকে অসীম কা্ল অবধি ছুটে চলেছে মহাকালের রথ, এর মাঝের সময়টাই মনে হয় আমাদের ভাবনা এবং পথ চলার সময়টুকু।

Summary
'আমফান ঝড়'- যারা এর পরেও বেঁচে ছিল
Article Name
'আমফান ঝড়'- যারা এর পরেও বেঁচে ছিল
Description
আমাজনের আগুনের রেশ কাটার আগেই, এবারের শেষ গ্রীষ্মে "আমফান ঝড়" বা "উম্পুন ঝড়" তান্ডবে কলকাতা শহরে পড়ে থাকা পাঁচ হাজার গাছ দাঁড় করিয়ে দিল অনেক প্রশ্নের সামনে। কিছু হেলে যাওয়া গাছ সরকারি উদ্যোগে আবার প্রতিস্থাপন হয়েছে, তাদের অনেকে বেঁচেও গেছে। অনেকে নিজস্ব উদ্যোগে গাছের কাটা ডালে ওষুধ দিয়ে প্লাস্টিক বেঁধে দিলেন, তাতে কিছু ডালপালা গজিয়েও উঠল। মানে মানুষ মন দিয়ে চেষ্টা করলেই, পরিবেশের জন্য অনেক বেশি করতে পারে
Author
৩ comments

Leave a Reply

Solve : *
17 + 25 =