ঋতুকাহন – আনারী আঙ্গিক (ঋতুচক্র নিয়ে প্রচলিত ভাবনা)

ঋতুকাহন - আনারী আঙ্গিক (ঋতুচক্র নিয়ে প্রচলিত ভাবনা)

ঋতুকাহন – আনারী আঙ্গিক (ঋতুচক্র নিয়ে প্রচলিত ভাবনা)

ঋতুকাহন – আনারী আঙ্গিক (ঋতুচক্র নিয়ে প্রচলিত ভাবনা) 669 1024 সীমানা ছাড়িয়ে

বর্তমান যুগে পুরুষের কাছে ঋতুচক্র।

ঋতুচক্র নারীজীবনের নৈমিত্তিক বিষয় হলেও পুরুষেরা “নোংরা” বিষয়টি নিয়ে কিন্ত মৌনতায় স্বচ্ছন্দ। বালক থেকে পুরুষ হয়ে ওঠার সময়ে এই “মেয়েলি ব্যাপার” নিয়ে বাড়ির কারুর সঙ্গেই কথা হয় না। এভাবেই তার জিজ্ঞাসার বিষয়টা গর্হিতও হয়ে যায় একদিন। কখনও হয়ত বয়ঃসন্ধির সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে কথা ওঠে। মিশে যায় কিছু অপরিণত মানুষের ভাসা-ভাসা জ্ঞান, অসুখ বলে চলে আসা অচলায়তন ও বাকিটা কল্পনা। বিষয়টি আরো ধোঁয়াটে হয়ে ওঠে। আন্তর্জালের আগের যুগে মোটের ওপর পিরিয়ড নিয়ে এই ছিল পুরুষদের জ্ঞানের দৌড়। আন্তর্জাল এসেও কি বিষয়টা খুব বদলেছে? এর বিজ্ঞানের দিকটা আজও অবহেলিত। কি ভাবছেন এ যুগের মানুষ ঋতুচক্র নিয়ে?

 

ঋতুচক্র নিয়ে তাঁরা কি ভাবেন সেইসব মানুষেরা যাঁদের কেউই জন্মসূত্রে স্ত্রী লিঙ্গের অধিকারী নন

একদিন হঠাৎ প্রস্তাব এল “ঋতুকাহন – আনারী আঙ্গিক” বইটি পড়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানানোর। বইটি চিন্তায় মৌলিক। ঋতুচক্র নিয়ে কিছু মানুষের চিন্তা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সেই মানুষেরা জন্মসূত্রে কেউই স্ত্রী লিঙ্গের অধিকারী নন। যে সময় বইটি যন্ত্রস্থ ছিল, সে সময়ে পিরিয়ড শব্দটি ছিল খুব প্রাসঙ্গিক। একদিকে শবরীমালা, আরেকদিকে জনপ্রিয় সিনেমা প্যাডম্যান। দুর্ভাগ্যবশত বইটি প্রকাশের পরেই বিশ্ব চলে আসে অতিমারীর কবলে।

 

পাঠ প্রতিক্রিয়া “ঋতুকাহন – আনারী আঙ্গিক” https://www.facebook.com/anari.angik/বইটি আঠারোটি লেখায় সমৃদ্ধ এবং একশ’ দশ পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ। মননশীল মানুষকে ঋতুচক্র সংক্রান্ত তথ্যে সমৃদ্ধ করে।

সেগুলির সামান্য কিছু উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক। যেমন –

  • ঋতুচক্রের চারদিন নারীকে কিভাবে কোথায় দেখা হয়। তাতে ভারতীয় আদিবাসী বা আসাম অথবা মহারাষ্ট্রের লোকাচার যেমন আছে, তেমন আছে বৈদেশিক তথ্য। আফগানিস্তান, নেপাল, জাপান বেশ কিছু উদাহরণ এসেছে বারবার।
  • কাপড় ছাড়াও ঘুঁটে, বালি, ঘাস ইত্যাদির ব্যবহারও চলছে বর্তমান সময়েও।
  • স্যানিটারি ন্যাপকিনের আগমন কমপক্ষে সোয়া শ’ বছর। ব্যবহার কিন্ত করেন ভারতে ঋতুমতী নারীদের মাত্র ১২%। অনেকক্ষেত্রে আবার আর্থিক প্রতিপত্তি জানানোর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে এই প্যাড।
  • এই নিয়ে অজ্ঞানতা আর ধোঁয়াশার শেষ নেই। যেমন – উচ্চ শোষণক্ষমতা সম্পন্ন প্যাড এক অংশের মানুষ মনে করছেন দুরারোগ্য ব্যাধি ডেকে আনতে পারে। সে নিয়ে সরকারের তরফেও কিছু বার্তা নেই।
  • নারীমহলে স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রবেশ করার পরেও তা ঘনঘন বদলানোর অভ্যাস তৈরি হয়নি। একই প্যাডে ছয় থেকে বারো ঘন্টা চালানোর প্রবণতা দেখা যায়। বিপজ্জনক!
  • পিরিয়ডের সময়ে মেয়েরাও নিজেদের অপবিত্র বলে মনে করেন। সঙ্গমে, আরাধনায় ও চলাফেরায় তা বারবার প্রতিফলিত হয়। এ প্রসঙ্গে একটি লেখায় পরমহংসদেবের কথাই তুলে ধরেছেন এক লেখক। রামকৃষ্ণদেব সারদা দেবীকে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি শরীরের কোন অংশকে অশুচি বলে মনে করেন। চর্ম, মাংস, মজ্জা, হাড় ইত্যাদির মধ্যে। সারদা দেবী পরমহংসদেবের কথা মেনে এই নিয়ে চলে আসা অচলায়তন ভঙ্গ করেন। মানুষকে ঋতুচক্র চলাকালীন পুজো করতে উৎসাহও দেন।
  • অশিক্ষার আঁধারে ঢাকা পড়ে আছে কিছু সত্য। আজীবন পুরুষদের অজানা থেকে যায় – এই চারদিন শারীরিক প্রতিকূলতায় একটু বিশ্রাম, পুষ্টি ও যত্ন প্রয়োজন।

 

ঋতুচক্র নিয়ে বলতে বলতেই প্রশ্নেও বিদ্ধ করে বারবার “ঋতুকাহন – আনারী আঙ্গিক” 

যেমন –

  • গঞ্জের ওষুধের দোকানে গিয়ে কেন তার সহপাঠীনীর জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে গিয়ে যুবকের মনে হবে “কি বলব”।
  • ঋতুমতী তো সকলেই, প্রকৃত অর্থে প্রশ্ন করলে নারী তাঁদের মধ্যে ক’জন।
  • যিনি রজস্বলা নন তিনি নারী নন!
  • শুধু প্রসব করা আর না করার সঙ্গে মাতৃত্ব জড়িত নয়। রূপান্তরিতরা মা হতে পারবেন না, এ বিভ্রমের কেন এত জনপ্রিয়তা।
  • কেন সমকামী জুটির একজনকে অপরের বাড়ির গুরুজনকে আলতা মাখা প্যাড দেখিয়ে বোঝাতে হয়, স্তনের বিকাশ না হলেও তিনি নারীই।
  • তন্ত্রসাধনায় এর একটা শক্তপোক্ত দিক আছে। এটি সাধনার বস্তু। তাও প্রাচীন কাল থেকেই নরের কাছে কেন অপবিত্র।
  • পুরুষ কিসে হয়? প্রকৃতির চরিতার্থে। তাহলে প্রকৃতির সুন্দরতম সৃষ্টি নারীর স্বকীয়তাকে মানতে তার অসুবিধা কেন।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের বইটি আমাদের ঋতুচক্র নিয়ে ভাবায়

যেমন –

হরণ করতে পোষাকের পেছনে লাল রং লাগিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর দোষ তিনি মহিলা চরিত্রে অভিনয় করতেন। আমার কথা – একবার ভেবে দেখুন পুরুষ বন্ধুরা, এমন হলে আমরা কি ভাবব। “প্যান্ট হলুদ” বলে প্রবচন মনে পড়ল। রংটা হলুদ হলেও কি একইরকম লজ্জা লাগত, নাকি কম।

  • কন্ট্রাসেপ্টিভ সম্বন্ধে ধারণা হওয়ার পরেও তার বহুলাংশেই সমস্যা আছে। আনন্দ, স্বাচ্ছন্দ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য আনতে শহুরে শিক্ষিতদের মধ্যে একটা ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। তাঁরা “সেফ পিরিয়ডে” ঘনিষ্ঠ হতে পছন্দ করছেন। অন্য সময় নিজের রিপু দমন বা সঙ্গীর রিপু অবহেলা করছেন। তথ্য কিন্ত জিততে শুরু করেছে আবেগের সঙ্গে।
  • বহুদিন একসাথে থেকেও এই ব্যাথার গভীরতা আমরা বুঝি না।
  • কোন মাসে একবার, কখনও দু’বার, কখনও দু’মাসে একবার। ছন্দ কাটলে হয়ত নতুন কিছুর আশা বা আশংকা। এই অনিশ্চয়তার মনস্তাত্বিক চাপ বোঝার চেষ্টা শেষ কবে করেছি আমরা?
  • পুরুষ কি নিজের কাছে প্রশ্ন করে নিশ্চিত হয়েছে- এসব “ঘৃণ্য, অপবিত্র” ও “রক্তমাখা ন্যাকড়া” বলার ও ভাবার মধ্যে বিপরীত লিঙ্গকে খাটো বা পদানত করার কোন উদ্দেশ্য নেই!
  • মন্দিরে পিরিয়ডের চারদিন না যাওয়ার একটি দুর্বল ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আগে মন্দিরগুলি বেশ উঁচু হত। ওই চারদিন সিঁড়ি ভাঙার পরিশ্রম করা থেকে মেয়েদের রেহাই দেওয়া হত। পুকুরে স্নান না করার রীতির স্বপক্ষে বলা হয় আগে যেহেতু পুকুরের জলেই অনেক প্রয়োজন মিটত, তাই দূষণের আশংকা ছিল। এত পরিবর্তনের মধ্যে পুরুষ সমাজে কিভাবে যেন স্থিতাবস্থা রয়েই গেছে।
  • এ তো গেল পুরুষদের কথা। মহিলাদের কথাও বলার আছে। ঋতুচক্র নারীর সম্পদ ও স্বকীয়তা জেনেও মহিলারা কিন্ত একে প্রতিবন্ধকতা ও “অস্বস্তিকর বিষয়” বলেই মনে করেন।

 

ঋতুচক্র নিয়ে তাঁদের ভাবনাগুলি বাছতে কেউ বেছে নিয়েছেন গল্প, কেউ স্মৃতির আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ গবেষণা করে সিরিয়াস প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।

লেখাগুলির মধ্যে শ্রী ঘটক, শীর্ষেন্দু গায়েন, মৈথিল দাস, শোভন মুখোপাধ্যায়, ভাস্বর নন্দী, কুলাবধূত সৎপুরানন্দের লেখা অনেকদিন মনে থাকবে। চপল ভাদুড়ি, সন্ন্যাসী লোহার প্রমুখের লেখাও সুপাঠ্য ও ভাল লাগল। কিছু লেখা বিষয়টিকে স্পর্শ করেনি অথবা শব্দ, নস্টালজিয়া ও তথ্যে ভারক্রান্ত। তৎসত্ত্বেও বইটি কিনে পড়তে অবশ্যই অনুরোধ করব। দাম কম। বাঁধাই, প্রচ্ছদ, সম্পাদনা ভাল। সম্পাদককে ধন্যবাদ এমন মৌলিক বিষয় নির্বাচনের জন্য। তবে প্রতি লেখার নীচে লেখক পরিচিতি না থাকলে আরো ভাল হত। এটুকু আবডাল রেখে পরষ্পরকে চিনে নিতে লেখক-লেখিকা ও পাঠক-পাঠিকা পছন্দ করেন বলেই আমার ব্যক্তিগত মত।

আমার অন্য লেখার লিংক – https://bit.ly/নেপথ্যচারী

দেবাঞ্জন বাগচী।

Summary
Review Date
Reviewed Item
বই - ঋতুকাহন - (আনারী আঙ্গিক )
Author Rating
41star1star1star1stargray
Product Name
ঋতুকাহন - আনারী আঙ্গিক

Leave a Reply

Solve : *
2 × 29 =