দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি

দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি : যৌবন পেরিয়ে আসা এক নারী, এক পুরুষ ও সেতুর গল্প।

দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি

দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি 720 1024 সীমানা ছাড়িয়ে

দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি : জীবনের মধ্যভাগে এসে পথ ভোলার গল্প

মুখবন্ধ

রবার্ট জেমস ওয়ালারের বিখ্যাত বই “দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি” ছিল আদ্যান্ত এক প্রেমের গল্প। এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, সিনেমা রিলিজ করার আগেই সাড়ে নয় মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। সেই বই নিয়ে যখন ক্লিন্ট ইস্টউড সিনেমা বানাতে শুরু করলেন তখন অনেকেই অবাক হন। এর কিছুদিন আগেও ক্লিন্ট ইস্টউড “দা আনফরগিভেন” এবং “ইন দা লাইন অফ ফায়ার”-এর মতন সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী সিনেমা বানিয়েছেন। সেই ক্লিন্ট কিনা রোমান্টিক সিনেমায়! সিনেমার শুরু দুই ভাই-বোনকে নিয়ে। সদ্যপ্রয়াত মায়ের ইচ্ছাপত্র খুলে কিছু অদ্ভুত ইচ্ছা দেখে তারা অবাক।

“দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি” সিনেমার রেটিং

– ১) রজার ইবার্ট ৩.৫/৪ (২) রটন টম্যাটোস ৯০% (৩) আই এম ডি বি ৭.৬/১০ (৪) প্রতিবেদক ৯৫/১০০

প্রেক্ষাপট

বিকেল, সে ভারী অদ্ভুত সময়। আমেরিকার আইওয়া, সময় ষাটের দশকের মধ্যভাগ। একদিন এক হাল্কা রোদ পড়ে আসা মায়াবী বিকেল যখন পাকা ভুট্টার ক্ষেত ছুঁয়েছে,  ধূলো ঊড়িয়ে একটি গাড়ি এসে দাঁড়ায় এক খামারবাড়ির সামনে। বাইরে নিজের বাড়ির হাতায় দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন বিগতযৌবনা ফ্রানচেস্কা। ভদ্রমহিলা জন্মসূত্রে ইটালিয়ান। ভালেবেসে বিয়ে করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে এক মার্কিন সৈনিককে। থিতু হয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই। জীবন অনেক বদলেছে। এখন মেয়ের বয়স চৌদ্দ আর ছেলে পনেরো। উনি ‘হোমমেকার’, মুখে রোদ পড়ে আসা বিকেলের সোনালী আভা। পাখির ডানার মতো ভুরুতে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের ভাঁজ। অনেকদিন পরে অবসর পেয়েছেন চার দিনের। ওঁর স্বামী, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে গেছেন দূরে মেলা দেখাতে।
ধুলো ওড়ানো গাড়ি থেকে নেমে আসেন এক পথ হারানো প্রৌঢ়। চুল প্রায় সব সাদা, চামড়ার রঙ একটু হলেও রোদে পুড়ে তামাটে। লম্বা পেটানো চেহারার লোকটার কাছে বয়স যেন হেরে গেছে। পেশায় National Geographyর ফোটোগ্রাফার। কিছু country side covered ব্রীজের ছবি তুলতে রবার্ট Washington থেকে বহুদূরে গাড়ী চালিয়ে এসেছেন।
আলাপ জমে ওঠে এই লোকটির সাথে। সারা বিশ্বে ঘুরে ঘুরে ছবি তোলাই এঁর কাজ, সংসার করেন নি কোনোদিনও। নিজের সম্বন্ধে অকপটে বলেন – আমি একা থাকি, কিন্ত সন্ত নই। কেমন যেন বিগত স্বপ্নের সাথে মিলে যায় এই লোকটি। সংযত, সংবেদনশীল লোকটি ভীষন ভালো বন্ধু হয়ে যায় একদিনে। রবার্টও তাঁর জীবন ফ্রানচেস্কার সাথে জড়িয়ে যেতে থাকলে বাধা দেন না। জীবনের চার দিন ওঁদের কাটে পরষ্পরের সঙ্গে, যা দুজনের জীবনকেই বদলে দেয়। সেই চার দিন কেটে যায় আলোর থেকেও দ্রুত। রবার্ট বলে – চলো আমার সাথে, এত নিশ্চিতভাবে মানুষ আরেকজনকে জীবনে একবারই চাইতে পারে।
দুই বাচ্চার মা ফ্রানচেস্কা তার সন্তান আর স্বামীকে ত্যাগ করে কোথাওই যেতে পারে না। বাড়ী ফিরে আসে তার পরিবার। রবার্ট বলে- আমি শহরে থাকবো আরও দু’দিন, যদি তুমি মনস্থির করতে পারো চলে এস।
আরও দু’দিন কেটে যায়। যেন এই চারদিন জীবনে আসেইনি , খানিকটা এমনই ব্যস্ততায়। তারপর “একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে” বাজার করে ফেরার সময়, হঠাৎ ফ্রানচেস্কার চোখ পড়ে গাড়ির বৃষ্টিস্নাত windscreen এর বাইরে। রাস্তার ওপারে তার দিকে তাকিয়ে একনাগাড়ে বৃষ্টি ভুলে ভিজে চলেছে রবার্ট। বৃষ্টির ফোটাগুলো যেন আজ তার চোখের জল ঢাকতেই নেমে এসেছে। বুঝতে পারে আজকের পর সে তাকে দেখতে পাবে না কোনোদিনও। ওদিকে চালকের আসনে তার স্বামী, বিদায় আসন্ন। সব শক্তি এক করে সে চেষ্টা করে গাড়ির দরজা খুলে নেমে যেতে। ফ্রানচেস্কার মন বলছে কাল থেকে তার জীবন সাধারন থেকে আরো সাধারন হয়ে যাবে। সে ভাবে গলির বাঁকে মিলিয়ে যায় রবার্টের ট্রাক।

প্রতিবেদকের ভাবনা

ঠিক পথে হেঁটেও আমরা গন্তব্যে পৌঁছতে পারি না, আবার কিছু পথ ভুল করেও মানুষ ঠিক জায়গায় পৌঁছে যায়।  সব সুন্দর সুনশান স্টেশনে নামা হয় না, আবার সুনশান স্টেশনের প্লাটফর্মে বসে থাকা নিস্তরঙ্গ জীবনসম্পন্ন সব মানুষ এক্সপ্রেস ট্রেন চড়তে পারেন না। সিনেমাটি এই চিরন্তন আলৌকিক মূহুর্তেই আটকে থাকে। এরকম একটা হাল্কা রোদ পড়ে আসা মায়াবী বিকেল এখনো যখন পাকা ভুট্টার খেত ছোঁয়। বড় মায়াময় এই জীবন আর পড়ন্ত বিকেল ভারী অদ্ভুত সময়। কি বা পড়ে থাকে, নিভে আসা আলোয় মাখা একটা মেঠো পথ, যেখানে ধূলো উড়িয়ে কোনো ট্রাক এসে আর দাঁড়াবে না কোনোদিন।
ফ্রানচেস্কার শেষ ইচ্ছা কি ও দু’জনের শেষ যোগাযোগটা কি ছিল তার জন্য সিনেমাটা দেখে নিতে অনুরোধ করব। যেখানে এই গল্পটি আলাদা আর বাকি তথাকথিত অবৈধ প্রেম কাহিনীর থেকে, তা হল এই গল্পের শ্রোতা ফ্রানচেস্কার পুত্র ও কন্যা। কাহিনী সীমাবদ্ধ একটি চিঠির জবানবন্দীতেই। যা ফ্রানচেস্কার ছেলে-মেয়ে আবিষ্কার করে মায়ের মৃত্যুর পর।

টুকরো কথা

ফ্রানচেস্কার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মেরিল স্ট্রিপ ও রবার্টের ভূমিকায় নির্দেশক ক্লিন্ট ইস্টউড নিজেই। এর আগে অবধি দর্শকেরা ক্লিন্ট ইস্টউডকে ঘোড়া চড়তে দেখেই অভ্যস্ত ছিলেন। সেখানে এমন রোমান্টিক সিনেমার মধ্যবয়স্ক শান্ত-ভদ্র ফটোগ্রাফার হিসেবে নিজেকে নিজের টাইপকাস্টের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে বড় ঝুঁকি নেন ক্লিন্ট ইস্টউড। প্রথমে রবার্ট রেডফোর্ডের কথা ভাবা হলেও ক্লিন্ট ঝুঁকি নেন এবং সফল হন। সিনামায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মন জিতে নেয় এবং এটি বক্স অফিসে ঝড় তোলে। তিনি নিজে পুরস্কৃত না হলেও মেরিল স্ট্রিপ মুখ্য ভূমিকায় অস্কার ও গোল্ডেন গ্লোব জিতেছিলেন। মেরিল স্ট্রিপ এই সিনেমায় নায়িকার বয়সের সঙ্গে সাযুজ্য আনতে নিজের ওজন বাড়িয়েছিলেন। চিত্রনাট্যের গুনে বন্ধ ঘরের ভেতরেও  দর্শকেরা টানটান উত্তেজনায় বসে থেকেছেন। এরপরেই চিত্রনাট্যকার রিচার্ড লা গ্রেভেন্স স্পিলবার্গের “আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্স” চিত্রনাট্য লেখার সুযোগ পান।
যে সুন্দর কাঠের হেরিটেজ ব্রিজটিকে কেন্দ্র করে সিনেমাটি, সেটি সিনেমা তৈরির সাত বছর পর, দু’হাজার দুই সালে আগুনে ভস্মীভূত হয়েছিল। সিনেমার লোকেশন, লাইট ও সেট অদ্ভুত সুন্দর। এখানে উল্লেখ করা দরকার এই খামারবাড়িটি কিন্ত ত্রিশ বছর আগের একটি পরিত্যক্ত ও পোড়া খামারবাড়ি ছিল। যার পুনরুজ্জীবন ঘটানো হয়।

দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি তে যে যে সংলাপ মনে থেকে যাবে –

১) “আমার সুন্দর স্বপ্নগুলো সত্যি হয়নি, তাতেও আমি খুশি। কারন আমি কিছু সুন্দর স্বপ্ন দেখেছি” ২)  “তোমাকে আমার  প্রয়োজন হোক আমি চাই না, কারণ তোমাকে আমি পাব না।” ৩) “বিশ্বব্রহ্মান্ড ভরা অনিশ্চয়তার মধ্যে এমন নিশ্চয়তা জীবনে একবারই মাত্র আসে”।

আর ও পড়ুন http://debanjanbagchi.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%b8-%e0%a6%85%e0%a6%ab-%e0%a6%87%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%9f/

Summary
Video Image
Review Date
Reviewed Item
দা ব্রিজেস অফ ম্যাডিসন কাউন্টি
Author Rating
41star1star1star1stargray

Leave a Reply

Solve : *
22 ⁄ 2 =