নাগরিক দিনলিপি ১৬ – স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

নাগরিক দিনলিপি ১৬:স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

নাগরিক দিনলিপি ১৬ – স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

নাগরিক দিনলিপি ১৬ – স্বপ্নের ফেরিওয়ালা 1024 602 সীমানা ছাড়িয়ে

নাগরিক দিনলিপি ১৬ – স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

সুনীল কুমার পাল,নাগরিক দিনলিপি ষোলো তে আজ বলব  স্বপ্নের ফেরিওয়ালা সুনীল বাবুর কথা ।ওনার সঙ্গে আলাপ বছর দশেক আগে। কিছু টাকাপয়সা জমানোর শখ হয়েছিল মিউচুয়াল ফান্ডে, তাই যোগাযোগ করছিলেন জয়রাজ বলে এক ছোকরা। এসব লাইনের লোকেরা যেমন হয়, হিন্দি-বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে এক নতুন ভাষায় কথা বলত। তাতে ভাষার স্বকীয়তা না থাকলেও স্মার্টনেস প্রকাশ পায়। যেদিন আসার কথা সেদিন সে ছোকরা ব্যস্ত হয়ে পড়ায়, হাজির হলেন সুনীল কুমার পাল। জয়রাজ ছিল কথায় বেশ চালিয়াৎ গোছের ছোকরা, তাকে নিয়ে একটু ভয়েই ছিলাম – কি টুপি পরায় কে জানে! সুনীলবাবুকে দেখে সে ভয় জল হয়ে গেল।

নাগরিক জীবনে গ্ৰামের সুবাস

মধ্যবয়সী, স্বল্পকেশ, অসিতবরণ, অনুচ্চ ও স্ফীত নাক, অবিন্যস্ত দাঁত, মধ্যপ্রদেশ স্ফীত, কাঁধে কালো অপরিষ্কার সাইড ব্যাগ, প্যান্টে ঘাম শুকানোর সাদা দাগ। জামা তখনও গায়ে লেপ্টে আছে। স্যার সম্বোধন প্রায় “ছ্যার”-এর মতন। চল্লিশ পেরিয়ে নতুন পেশা নির্বাচন করেছেন। যারা টাকাপয়সা বাড়ানোর স্বপ্ন ফেরি করে, তারা এমন কোনদিক থেকেই হয়না। গ্রামের সুবাস এই মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের সঙ্গ ত্যাগ করবে না বলে বদ্ধপরিকর।

‘SIP না  Self Induced Problem ?’-এ এক নাগরিক সমস্যা

যাইহোক, সহকর্মীরা ওঁর “Appearance”এ বিরক্ত হলেও, আমি বিশ্বাস করে ফেললাম এমন একজনকে। এমনভাবেই চলতে অভ্যস্ত – না জামাকাপড়ে বা ব্র্যান্ডে নির্ভরযোগ্যতা পাই, না আমি রক্তের সম্পর্কের প্রতি সশ্রদ্ধ। চালু হয়ে গেল প্রতি মাসের Systematic Investment Plan। ওঁকে মনে রাখার তেমন কারণ নেই, যদিও মাঝে মাঝই উপযাচক হয়ে ফোন করতেন উনি। আমিও ব্যস্ততার দোহাই দিতাম।

“ঐ যে দূরে অশ্বথ্থ গাছ – ও তো পথিকজনের ছাতা ,তলায় ঘাসের গালচেখানি আদর করে পাতা ”

কয়েকমাস পর একদিন দুপুরে কাজে বেরিয়েছি ট্যাক্সিতে, দেখি ভদ্রলোক গড়ের মাঠে এক গাছ তলায় বসে খাচ্ছেন ।এর কিছুদিন পর একদিন আবার আমার অফিসে এলেন। ওঁকে বললাম যে একদিন ওঁকে দেখেছি গাছতলায়। তার বেশি কথা গড়ায় নি, আবার কাটল কিছুদিন। ওই একই রাস্তা দিয়ে ফিরছিলাম বাসে করে, দেখি উনি সেই একই জায়গায় বসে মধ্যাহ্নভোজনে ব্যস্ত। এবার একটু অবাক হলাম। কিছুদিন পর আবার ফোন – “ছ্যার বলছিলাম কি একটা দারুন ইভেছট্মেন্ট প্ল্যান এসেছে…”। থামিয়ে জিজ্ঞেস করলাম সোজাসুজি , উনি ওখানেই রোজ মধ্যাহ্নভোজন সারেন কিনা। উত্তর সহজে আসেনি, বেশ খোঁচাতে হল। অবশেষে জানালেন ওই গাছটা নাকি সবেদা গাছ। বাংলাদেশে ওঁর ফেলে আসা বাড়িতে, একটা নাকি মায়ের লাগানো সবেদা গাছ ছিল। তাই সুযোগ হলে ওখানেই ওঁর খেতে ভাল লাগে।

“ভিখিরিরা স্বপ্ন পায়
তুষারের রাজধানী ধুয়ে যায় জ্যোৎস্নায়”

এভাবে ওঁর একটা জায়গা তৈরি হল। বাকি লোকজন নানান প্ল্যান নিয়ে এলে যতটা শক্তভাবে না বলে দিই, সেই তুলনায় উনি প্রশ্রয় পেতে থাকলেন। জানলাম ভদ্রলোক আটের দশকে সীমা পেরিয়ে ভাই-বোনকে নিয়ে শান্তিপুরে ডেরা বাঁধেন প্রথমে। ভাই-বোনকে থিতু হতে দিতে নিজের বিয়ে করা হয়নি। ইতিমধ্যে শান্তিপুরে কিছু একটা করেছিলেন রুজির ব্যবস্থা, সেটি ডুবেছে। তাই মাঝবয়সে মিউচুয়াল ফান্ডের সেলস এক্সিকিউটিভ।

ক্যালেন্ডার বদলাতে থাকল, আমাকে বিস্মিত করে সুনীলবাবু পেশায় উন্নতি করতে থাকলেন। আর কোন চাকরি করেন না, স্বাধীনভাবে এজেন্সি চালান। প্রথম চাকরি ছেড়ে একদিন আমার কিছু এককালীন অর্থাগম হল, ওঁকে ডাকলাম। সে বছর ছয়েক আগের কথা। শুনলাম ইতিমধ্যেই বেলঘরিয়ায় ফ্ল্যাট কিনেছেন বাইশ লাখ দিয়ে, গাড়ি কিনেছেন, নিজে চালান। উচ্চারণ যেমনই হোক ক্লায়েন্টের অফিসে গেলে আজকাল কোট-টাই পরেন। ওঁর অগোচরেই, আমিও ওঁর খুশির অংশীদার।

কয়েক বছর পর এবার আমার টাকার দরকার হল। ওঁকে তলব করলাম নিযুক্ত মূলধন ভাঙাতে। এবার শুনলাম উনি চলে গেছেন বোরালে ভাড়া বাড়িতে। এক ভাইয়ের চিকিৎসা ও ভাইপোর পড়াশোনার জন্য ওঁর ফ্ল্যাটে তাদের থাকতে দিয়েছেন। শরীর ভাল নয় দেখেই বোঝা যায়। স্বীকার করলেন ভোগার কথা। একা মানুষ, রান্নাও একাই করেন – একটু চিন্তিত হলাম বৈকি। বললাম রান্নার লোক রাখতে। জানালেন – “ব্যাসেলার” মানুষ কিনা, অমনভাবে ঘরে মহিলা আসলে ভাড়াবাড়িতে যদি সমস্যা হয়। মহানগরে এই সমস্যা হতে পারে, আমি ভাবিনি। একটু অপ্রস্তুত হলাম। বললেন, অজানা অচেনা মহিলা ঘরে ঢোকানো যায় না।

নাগরিক অভিশাপ

কিছুদিন আগে যখন ওঁর সঙ্গে দেখা হল, তখন উনি বাসা বদলে যাদবপুরে। শরীর অনেকটাই ভাল বলে মনে হয়। যত্ন নিয়ে অবশেষে নিজের চিকিৎসা করিয়েছেন। কুশল বিনিময়ের পর জানালেন বেলঘরিয়ার ফ্ল্যাট বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ভাইপো কিছু একটা গোলযোগে জড়িয়ে পড়ার পর বিপদ হয়েছিল। ভাইয়ের পরিবারকে পাড়ার লোকেরা উচ্ছেদ করেছে। শুধু তাতেই থামেনি, সুনীলবাবুকেও ঢুকতে দেয় নি। বলেছে আগে ভাইপোকে হাজির করতে। অবশেষে উনি অর্ধেক দামে ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়েছেন। বললাম, সে কি মশাই! আপনার তো অনেক ক্ষতি হল! আরেকটু দেখলেন না?

নাগরিক আকাঙ্খা

বললেন, “ছ্যার” ওইসব ভেবে ভেবে “ছুগার” হয়ে যাচ্ছিল। বেচে মন ভালই আছে। গায়ে “সামড়া” থাকলে “সুলকানি” হবেই। টাকা আসে, কতই খরচও হয়। এই তো আগের বছর ভাগ্নীর বিয়ে দিলাম।

– ভাগ্নী! সে কি! এখনও ভাই-বোনকে আপনিই টানছেন?
– আমি না টানলে কি করে ওদের “সলবে” ,“ছ্যার”? সেই ওপার থেকে এসে ওরা লেখাপড়া কিছুই শিখতে পারেনি। ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারেনি ওরা।
– এখন ওই সবেদা গাছতলায় বসে দুপুরে খান আর?
– না ছ্যার আরেকটা গাছ পেয়েছি যাদবপুরে, বলে হাসলেন ফিক করে।
– কত খরচ করলেন ভাগ্নীর বিয়েতে?
– তা ধরেন লাখ কয়েক, প্রায় তিনশ’ লোক এসেছিল তো। এই তো আমার কাজ প্রায় শেষ। এরা এবার দাঁড়ালেই আমাকে দেখবে। এক ভাগ্নে রেলে চাকরি পেল, লিলুয়াতে আছে। আর দুই একটা কাজ বাকি।
– কি কি বাকি শুনি?
একটু থেমে বললেন, আর কিছু টাকা পয়সা জমাতে হবে। শরীর-স্বাস্থ্য হুট করে খারাপ হতে পারে।

“স্বপ্ন স্বপ্ন স্বপ্ন , স্বপ্ন দেখে মন”

– টাকার চাহিদা কি শেষ হয় নাকি মানুষের! কামাচ্ছেন তো, ও’কথা বাদ দিন। আর কি কি?
– একটা বিয়ে করার খুব স্বপ্ন ছিল। চেষ্টা করি, আমায় পছন্দ হয়না কারুর। বিয়ে হলে একটু জিরোতে পারি। অনেক ছোটবেলা থেকে আমার ইচ্ছা এটা, দেখি হয় কিনা।
চুপ করে মাথা নিচু করে নিলাম। বললাম, চলুন নীচে গিয়ে চা খেয়ে আসি।

গরম চা আমি অভ্যস্ত দ্রুততায় কয়েক চুমুকে শেষ করে দিলাম। হাতে অপেক্ষমাণ খালি ভাঁড়। সে জানে আর কয়েকমুহূর্ত পর তার স্থান হবে ডাস্টবিনে। সুনীলবাবু খুব আস্তে আস্তে চা’য়ে চুমুক দিচ্ছেন। প্রতি চুমুকে চায়ের স্বাদ চারিয়ে যাচ্ছে ওঁর মুখের সদাহাস্য অনুভূতির কোনায় কোনায়।

শুধু চা নয়, জীবনের স্বাদও নেওয়ারও একটা ক্ষমতা কিভাবে যেন বাঁচিয়ে রেখেছেন ভদ্রলোক। এমন মিষ্টি-নরম স্বপ্ন পঞ্চাশ পেরিয়ে যে এত গভীরভাবে লালন করে, স্বপ্ন ফেরি করার পেশা তাকেই মানায়। কত ধমকেছি এঁকে সময়-অসময়ে ফোন করার জন্য। একটু নরম হতেই পারতাম। প্রথম আলাপের সময় ওঁর সহকর্মীরা যাঁদের বুদ্ধি দিয়েছিলেন, আমার সেইসব পরিচিতদের অনেকেরই লাভ হয়নি। তবে, ওঁর থেকে আমার সত্যি কখনও আর্থিক ক্ষতি হয়নি, আখেরে লাভই হয়েছে। স্বপ্ন বিক্রি সুট-টাই পরা চালিয়াত অল্পবয়সী ছোকরাদের চেয়ে ইনি সত্যিই অনেক অনেক মাইল এগিয়ে। অবাক হয়ে দেখলাম, সবই অপচয় নয়। কখনও এমন কাউকে বিশ্বাস করে কিছু ফিরে পাওয়াও তো গেল!

ময়দানের সবেদা গাছের সঙ্গে এঁর কি অন্য কোন সাদৃশ্যও আছে? ভাবলাম, একদিন ওঁর সঙ্গে সবেদা গাছের তলায় বসে মধ্যাহ্নভোজন করলে কেমন হয়!

যদি ওঁর মতন সত্যি সত্যি, আমিও স্বপ্ন দেখতে শিখে যাই !

 

আরও পড়ুন http://debanjanbagchi.com/স্বপ্ন-দেখার-গল্প/

Summary
নাগরিক দিনলিপি ১৬ – স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
Article Name
নাগরিক দিনলিপি ১৬ – স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
Author

Leave a Reply

Solve : *
29 − 22 =