যারা একটিও বাইসাইকেল চুরি করেনি

যারা একটিও বাইসাইকেল চুরি করেনি

যারা একটিও বাইসাইকেল চুরি করেনি

যারা একটিও বাইসাইকেল চুরি করেনি 1024 576 সীমানা ছাড়িয়ে

যারা একটিও বাইসাইকেল চুরি করেনি -নাগরিক দিনলিপি ১৭
*************************************************

প্রথম চোর
************
শীতকালের সকাল, সেদিন রোদ ওঠেনি। কুয়াশার চাদর সারারাত অভিসারের পরে গাছগুলোর গায়ের গন্ধে আবিষ্ট। রিক্সায় চড়ে স্কুল যেতে যেতে চোখে পড়ল ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে লুঙ্গি পরা লোকটাকে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। শালগাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি ল্যাম্পপোস্ট, পাশে টিউবওয়েল। লোকটাকে ঘিরে রয়েছে পাড়ার লোকেরা, একজন গোলাপের ডাল ভেঙে সপাটে এক ঘা দিতেই লোকটা কাতরে উঠল। শুনলাম চোর ধরা পড়েছে।

সময়টা উনিশশো আশির দশকের একদম প্রথমভাগ। ছোটখাটো সব ঘটনাতেও বড় আলোড়ন তৈরি হত। খবরের প্রত্যাশায় মানুষ পড়শীদের বাড়িতে রেডিও শুনতেও যেত। কাজেই এসব ঘটনা পাড়ায় টানা কয়েকদিন আলোড়ন তোলার জন্য যথেষ্ট। স্বাভাবিক ভাবেই লোক জমায়েত হয়ে গেছে। এমন ঘটনা বহুদিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকার কথা।

চোরকে পোস্টে বাঁধা। ল্যাম্পপোস্টগুলির আনুমানিক বয়স যদি ত্রিশও হয়, তাহলেও প্রায় দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই সেগুলি লাগানো হয়েছিল। ওপরে এনামেলের তৈরি বালব শেড, সেই শেডের নীচে একশ’ ওয়াটের বালবটায় কেউ টিপ প্র্যাকটিস করেছে। এরই শ’ওয়া দশক পরে কুয়াশা কেটে নতুন ভারত জাগতে শুরু করবে, জঙ্গলমহলের শালগাছ বাঁচাতে ল্যাম্পপোস্ট হবে সিমেন্টের।

যদিও চার দশক পর সেই মল্লভূম বা জঙ্গলমহলে গিয়ে দেখা যাবে বছর পাঁচ-সাতেকের বেশি পুরোন শালগাছ প্রায় নেই। পাড়ার ল্যাম্পপোস্ট সেজে উঠবে হ্যালোজেন বাতিতে, পাশে সাধারণ টিউবওয়েলের জায়গায় বিকল বাইশ পাইপের ডিপ টিউবওয়েল। সেই হ্যালোজেনের আলোয় সুন্দর করে পড়া যাবে কোন বিধায়কের করুনায় সেটি বসেছে। জল পড়েনা সেই প্রশ্ন করবেন না। দেশ ও রাজ্য তো উন্নতির শিখরে, আপনি যেন তার হাজার সুফল পাচ্ছেন !

ওভাবে কাউকে পিটতে দেখা শৈশবের পক্ষে মোটেই ভাল নয়। রিক্সায় যেতে যেতে বাবাকে অনুরোধ করলাম লোকটাকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। বাবাকে পাড়ার লোকজন বেশ পছন্দ করত, রিক্সা থেকে নেমে আমার অনুরোধে লোকজনকে বললেন এসব না করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে। তাতে ভিড় পাতলা হতে শুরু করল, মারমুখী যুবকদের উৎসাহেও খানিক ভাঁটা পড়ল। স্কুল থেকে ফিরে শুনলাম পুলিশ এসে নিয়ে গেছে তাকে।

ছেলেবেলায় সবাই ভাবে পুলিশের কাছে গেলেই সব সমস্যা মিটে যায়।

দ্বিতীয় চোর
**********
বছর আট-দশেক আগের কথা, পাড়ায় চুরি বেড়েছে। অভিনব এবং তাক লাগানো কায়দায় সম্ভবত অত্যন্ত অভিজ্ঞ চোরেরা রঙ্গমঞ্চে নেমেছে। শীতকালে এমন এক রাতে পাড়ার ছেলেরা ধরে ফেলল এক সন্দেহজনক যুবককে। প্যান্ট-শার্ট পরে লুকিয়েছিল অন্ধকারে। বুকপকেটে বসিরহাটের বিড়ি, প্যান্টের পকেটে বারুইপুরের ট্রেন টিকিট, ধরা পড়েছে কৃষ্ণনগরে। সে কোন কথারই উত্তর দেয় না, যেন বোবা। খানিক পরে শুরু হল মার। আমারও জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তির ও হতাশার কারণ হঠাৎ হয়ে উঠল সে। বেদম প্রহার চলল, যে যা পারি। কেউ কাঠ, কাউ হাত। ছেলেটি ভীত হয়ে প্যান্ট নোংরা করে ফেলল। ওদিকে পুলিশে ফোন করলাম, যিনি ফোন ধরলেন তিনি চোরের চেয়ে আমার তথ্য নিতেই এত বেশি উৎসাহী যে অচিরেই আশঙ্কিত বোধ করলাম। অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পরেও পুলিশ এল না, কেউ ফোনও করল না। রাত গড়িয়ে মধ্যরাত্রির দিকে, এবার সবার উৎসাহে ভাঁটা পড়ল। একসময় বোঝা গেল ছেলেটিকে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। সবাই রওয়ানা হল বাড়ির দিকে। প্রায় ভোররাতে পুলিশের গাড়ি এসেছিল একবার টহল দিতে।

যাঁরা মারামারি বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত তাঁরা জানেন এতে প্রচুর কায়িক ও মানসিক ক্লান্তি আসে। রাতে ঘুম হল না। পরদিন আমার অতি সক্রিয়তার বিষয়টা বেশ ভাবিয়ে তুলল। এতটা নিষ্ঠুরভাবে হাতে আইন তুলে নেওয়া আমার সহজাত নয়।

অন্ধকার থেকে আলো ফোটার প্রহরে বুঝলাম অনেকটা সরে এসেছি নিজের থেকে। দিনের আলোয় উদ্ভাসিত চতুর্দিক কিন্ত ছেলেবেলার সপ্তর্ষিমন্ডল দেখা যাচ্ছে না। ধ্রুবতারাও অদৃশ্য। এবার চোর আর পুলিশের সঙ্গে নিজের দোষটাও ভাবা উচিত।

মনে পড়ল ছেলেবেলার কথা। চোর বাঁধা ল্যাম্পপোস্টে। যিনি মারছিলেন গোলাপের ডাল দিয়ে, তাঁকে ক্ষমা করলাম। বহু বছর সময় লাগল।

অজস্র চোর
*********

মনে করুন এক ভদ্রলোকের নাম রায়চৌধুরী সাহেব। রায়চৌধুরী সাহেবের বয়স ষাটের কোঠায়। লাল টুকটুকে ফর্সা, লম্বা, একটু মোটা এবং শক্তপোক্ত হলেও আমুদে চেহারা। কলকাতায় অনেক পরিশ্রম করে গড়ে তুলছেন একের পর এক ব্যাবসায়িক সাম্রাজ্য। কোথাও নামজাদা ব্যাংক ভাড়া আছে, কোথাও হোটেল খুলেছেন।

হালে শুরু করেছেন এক অভিজাত পানশালা ও রেস্তোরাঁ। শুধুমাত্র সৌন্দর্যায়নেই ব্যয় করে বসেছেন কয়েক কোটি। স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে কত কী করা হয়েছে সেসব বোঝাচ্ছিলেন। রেস্তোরাঁয় যাঁরা পানাহারে মত্ত, বেশিরভাগই বেশ অবস্থাসম্পন্ন ঘরের ছেলেমেয়ে। শুধুমাত্র জনা দুয়েকের পোষাক ততটা কেতাদুরস্ত নয়। রায়চৌধুরী সাহেব সৃষ্টিসুখের উল্লাসে আমাকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে চলেছেন তাঁর পানশালা।

কখনও নিয়ে যাচ্ছেন – “প্রাইভেট ডাইনিং এরিয়া”য়, কখনও “হুক্কা বার”-এ, এমনকি সুবিশাল রান্নাঘরও ঘুরিয়ে দেখালেন। রান্নার উনুন, চিমনি, ফ্রিজ, বাসনপত্র, মশলাপাতি সবই আন্তর্জাতিক মানের এবং অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কর্মীদের লকডাউনের সময়ে বসিয়ে মাইনেও দিয়ে গেছেন। বললেন, নিজের হাতে গড়া সাম্রাজ্য এবার পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চান। ছেলেকে বিদেশ থেকে পড়িয়ে এনেছেন। পুত্র চিন্তাভাবনার উদ্ভাবনী ক্ষমতায় নাকি এখনই পিতাকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে।
কেদারায় বসেন অনেকটা বারান্দায় আরামকেদারায় বসার কায়দায়। গল্প করতে করতে বেশ খানিকটা সময় কাটল, আমার ওঠার সময় এসে গেল। পানীয় অফার করেছিলেন, কিন্ত আমি চা ছাড়া কিছু খাই না। পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন সিঁড়ির দিকে, পথ আটকে দাঁড়াল এক যুবক। মাথা নীচু করে একনাগাড়ে বলে গেল, স্যার আমি আপনার কাছে দু’বছর কাজ করছি। আমি তো কাজ করতেই চাই কিন্তু আমার নামে যেসব কথা আপনাকে বিশ্বাস করানো হয়েছে সেগুলো ঠিক নয়। লকডাউনের সময় তিনমাস মাইনে না পেয়েও কিন্তু আমি চাকরি বদলাইনি। আপনার কাছেই রয়ে গেছি। আমি আর নতুন করে আর কি বলব বলুন। বাবা এসেছে, বারণ করেছিলাম কিন্তু শুনল না আমার কথা। একবার আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়। যদি দু’মিনিট সময় দেন…

রায়চৌধুরী সাহেবের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। প্রথমে আমার দিকে তাকালেন, তারপর খুব দ্রুত বলে উঠলেন, এই দাঁড়াও তোমার সঙ্গে কথা বলছি। ওদিকে বস, এখানে এসে এসব কথা কেন!

এমন জায়গায় যে চোর ধরা পড়বে জন্মেও ভাবিনি, ফিক করে হেসে ফেলেছিলাম। ভাগ্যিস জীবনে নতুন একটা মুখোশ যোগ হয়েছে। যেটা জীবানুও আটকায়, সঙ্গে এমন বিড়ম্বনা থেকেও বাঁচায়। পানশালার দরজা খুলে মিশে গেলাম জনস্রোতে। মহানগরের পথে সদর্পে হেঁটে চলেছে অজস্র চোর- যারা একটিও বাইসাইকেল চুরি করেনি ।এবার একটু মনখারাপ হল, দাঁড়ালাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমি এক ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়েই দাঁড়িয়ে আছি! আবার হাঁটতে শুরু করলাম।

দ্বিতীয় চোরের প্রতি অতটা নির্দয় না হলেও হত।

দেবাঞ্জন বাগচী।

Summary
যারা একটিও বাইসাইকেল চুরি করেনি -নাগরিক দিনলিপি ১৭
Article Name
যারা একটিও বাইসাইকেল চুরি করেনি -নাগরিক দিনলিপি ১৭
Author

Leave a Reply

Solve : *
30 ⁄ 15 =