যেতে যেতে ১৫

যেতে যেতে ১৫ : বাসের দুই দরজা

যেতে যেতে ১৫

যেতে যেতে ১৫ 1024 683 সীমানা ছাড়িয়ে

যেতে যেতে ১৫

*********************

বাসের দুই দরজা

ভোর থেকে বৃষ্টি বন্ধ, বেরিয়েই একটা বাস পেয়ে গেলাম। বাড়ি থেকে পালালে ঠিক যেমনটা হওয়ার কথা। সে বাসে একটা গন্তব্যস্থল লেখা আছে বটে, তবে তা দিয়ে আমার কিছু যায় আসে না। আমি পথে যেখানে ইচ্ছে নেমে পড়ব, আবার যা হোক একটা বাসে উঠে পড়ব। বাস বেশ ফাঁকা, তাতেও আমার খুব কিছু যায় আসে না। আমি বাসের ছাদে চড়ে যাব, যেভাবে প্রচুর মানুষই যায়। তাদের যখন কিছু হয় না, আমারই বা কি হবে!

 

পিছনে লোহার মই বেয়ে বাসের ওপর উঠে দেখি বেশ কিছু লোকজন বসে আছে। একদম সামনের দিকে চলে গেলাম। যেখান থেকে সামনের পুরো রাস্তা দেখা যাচ্ছে। ছায়ায় মোড়া ভাঙাচোরা পথ, গ্রাম-গঞ্জ, চাষের মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলেছে আমার বাস। সহযাত্রীর সঙ্গে আলাপ জমে উঠল। বিহারে চলেছেন গরু কিনতে, ওখানে নাকি দুধেল গাই সস্তা। আবার গরু কিনলেই হবে না, সঙ্গে নাকি বাছুরও আনতে হবে। মনের মতন কিছু গরু পেলে ফেরার সময় গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে আসবেন। কথা বলার স্টাইল বেশ মজার। গত বছরকে বলে “গেল বছর” আর আগামী বছরকে বলেন “আর বছর”। গরু কতদিন বাঁচে প্রশ্ন করায় উত্তর দিলেন, সে তো দু’দশ বছর বাঁচে কিন্তু অতদিন কি আর দুধ দেয়!

 

পথে আরো দু’জন উঠে আস্তে আস্তে আমাদের কাছে এসে বসলেন। এঁরা পোড় খাওয়া যাত্রী, রীতিমত বাসের ভাড়া নিয়ে দর করে উঠলেন। কথা শুনে মনে হচ্ছে বেশ উদ্বিগ্ন। টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নাকি নবদ্বীপে বন্যা হওয়ার উপক্রম। বন্যা হলে বৃদ্ধ জ্যাঠা বিপদে পড়বেন, তাই এঁরা কয়েকদিনের জন্য নিয়ে আসতে বেরিয়েছেন। দুজনে একটা বিষয়েই চিন্তিত, যদি জ্যাঠা আসতে না চান!

 

মনে মনে একটু বিরক্ত হলাম, না আসবে তো বাপু তোমাদের অত পাকামো করতে কে বলে! খাবার-টাবার মজুত করে দিয়ে এলেই হয়, ইচ্ছে হলে তুমি গিয়ে কদিন পাহারা দিয়ে এস জ্যাঠাকে। বন্যা কি এমন খারাপ বিষয়! বরং বেশ ভালোই তো, চারিদিকে জল থাকবে। মানুষ ছাদে বা দোতলায় উঠে চারিদিকে জল দেখবে, চাইলে ছিপ দিয়ে মাছও ধরতে পারে। এমন তো আর রোজ রোজ হচ্ছে না। আমি এমন জায়গায় থাকি …. ফি বছর ভাবি এইবার বন্যা হবে কিন্তু কোনবারই হয় না।

 

নবদ্বীপ পেরিয়ে আমার বাস যাবে কালনা। নবদ্বীপে সবাই নেমে গেল, হুট করে দেখি পুরো বাসের ছাদের মালিক আমি। কেউ গেল নবদ্বীপে, কেউ বর্ধমানের বাস বদল করতে। এমন ফাঁকা ছাদে প্রেমিকাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে হয়। আমার বান্ধবী নাই বা কেউ থাকল, প্রেমিকার তো অভাব নেই! স্টেফি গ্রাফ, মাধুরী দীক্ষিত, গ্যাব্রিয়েলা সাবাতিনি, উইনোনা রাইডার – কাউকে একটা পাশে বসিয়ে নিলেই হয়। ভেবেচিন্তে মনে হল উইনোনা রাইডারকেই বসানো উচিত। এভাবে যেতে যেতে দুজনে নেমে যাব কোন গ্রামের মেলায়।

 

চিন্তায় ছেদ পড়ল নবদ্বীপ ছাড়িয়ে বেরিয়েই বাস আবার দাঁড়িয়ে গেল, স্টপেজের নাম হেমায়েতপুর। এখানে খানিক দাঁড়াবে। ছাদে অনেকখন বসেছিলাম, একটু সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বেশ আরাম হল। বাস যখন দাঁড়াবেই, নেমে একটু বাথরুম সেরে নিতে দোষ নেই। শুভ কাজটা শুরু করে মাঝপথে আসতেই দেখি বাস ছেড়ে চলে গেল। কোমরে হাত দিয়ে বাসটাকে মিলিয়ে যেতে দেখছিলাম, তারপর মন শক্ত করলাম। বাড়ি থেকে পালালে এমন হতেই পারে, আমি বরং এই সুযোগে নবদ্বীপে বন্যা দেখে আসি।

 

হেমায়েতপুর থেকে নবদ্বীপ হাঁটা পথ। পৌঁছে একটা রিক্সায় চড়ে গম্ভীরভাবে বললাম, বাসস্ট্যান্ডে চলুন। রিক্সাওয়ালা বললেন, মেন বাসস্ট্যান্ড তো? কোনটা মেন আর কোনটা ব্রাঞ্চ জানিনা, সেটা তো আর বুঝতে দিতে পারি না! বললাম, হ্যাঁ। পরে খানিকদূর গিয়ে, মাঝপথে নেমে পড়লাম। এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে কিছু লোক বিচলিত হয়ে সবার বিপদ বোঝাতে চেষ্টা করছে। ভদ্রলোক শান্তভাবে প্রায় ভাবলেশহীন মুখে শুনে যাচ্ছেন।

 

বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় জল বাড়তে শুরু করেছে, বেশ কিছু অঞ্চলে ইলেক্ট্রিক অফিস থেকে সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। কলগুলো জলের তলায় চলে যাওয়ার আগেই মানুষজন অনেকেই অন্যত্র কোথাও আশ্রয় নিতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগ মুদির দোকান খালি হয়ে এসেছে, লোকজন এটা-ওটা চেয়ে ফিরে যাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেকে আবার রাস্তায় কাপড় দিয়ে মাছ ধরছে।

 

এক বৃদ্ধাকে জনৈক প্রতিবেশী হাত ধরে একটি স্কুলের আশ্রয়ে নিয়ে চলেছে। সঙ্গে বৃদ্ধার বেশ কিছু ব্যবহার্য জিনিস থাকায় ছোকরা মুশকিলে পড়েছে। হাত লাগালাম, ভদ্রমহিলা জীবনদায়ী প্রেশার ও সুগারের ওষুধ বেশি নেই বলে চিন্তিত। ছেলেটির নাম নিলয়, সে কাল ব্যবস্থা করবে। ওদিকে ভদ্রমহিলা আবার প্রেসক্রিপশন আনেন নি। ছেলেটি বলল, বন্যার ভয়ে ওরা কাল থেকেই এলাকার একটি হাইস্কুলে পাড়ার লোকের থাকার ব্যবস্থা করা শুরু করেছে। গিয়ে দেখি এরা জিওলিন, হ্যালোজেন ট্যাবলেট, পানীয় জল, খিচুড়ি, ওষুধপত্র ইত্যাদি সব প্রস্তুতিই নিয়ে রেখেছে। স্কুলটা উঁচু, তবে স্কুলের মাঠে বৃষ্টিতে জল জমেছে নিচু জায়গায়, সেখানে বাচ্চারা খুব লুটোপুটি করছে। যেসব পরিবার ইতিমধ্যে আশ্রয় নিয়েছে তাদের কেউ বিভিন্ন কাজ করছে, কয়েকটি পরিবার আবার থাকার জায়গা নিয়ে ঝগড়া করছে।

নিলয় বলল, আরও কত কি হবে! রোজ একশ’ রকম ঝগড়া হবে। একদিকে বাপ-মা ঝগড়া করবে, আবার তাদের ছেলে-মেয়েগুলো প্রেম করবে। জল নামতে বেশি দেরি হলে খাবার আর জলের সমস্যা হবে। তখন আবার সবাই একসাথে কোমর বেঁধে দরবার করতে বের হবে। আমাদের এসব নিয়েই কাটবে কিছুদিন। তুমি কি এই পাড়ায় কারুর বাড়িতে এসেছ?

এবার প্রমাদ গুনলাম। কথা না বাড়িয়ে দুই-একটা গুলতাপ্পি মেরে কেটে পড়লাম। বন্যার বাজারে তেমন থাকার জায়গা এই শহরে নেই। শহরবাসীর মধ্যে চাপা উদ্বেগ। খিদে পেয়েছিল, একটা চায়ের দোকানে চা-বিস্কুট খেলাম। বসে ভাবছিলাম স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরা যাক, চোখ পড়ল উল্টোদিকের কলতলায়। যার রিক্সায় এসেছি সেই রিক্সাওয়ালা ঠাকুরের ছবি রিক্সার সিটে রেখে ভালভাবে জল দিয়ে রিক্সা পরিষ্কার করছেন। পুজো শেষ হওয়ার পর বললাম, যাবেন?

 

ভদ্রলোক সিটের তলা থেকে ব্যাগ বের করে গোছগাছ করছিলেন। বললেন, না।

  • এই স্টেশনে যাব।
  • না দাদা যাব না, আরেকটু এগিয়ে বাঁ দিকে স্ট্যান্ডে পেয়ে যাবেন। আচ্ছা তুমি একটু আগে আমার গাড়িতে উঠেছিলে না?
  • হ্যাঁ।
  • তুমি তো নেমে গেলেন সৎসঙ্গ বিহারের কাছে বাসট্যান্ডের ভাড়া দিয়ে, এদিকে কি করছ?
  • কিছুই না, হাঁটছি!
  • এখন বন্যার মধ্যে দাসপাড়া লেনে হাঁটছ, আবার স্টেশন যাবে! আচ্ছা দাঁড়াও আমাকেও যেতে হবে।

জানা গেল ওঁর নাম গণেশ বিশ্বাস। বাড়ি নবদ্বীপেই, কিন্তু বাড়িতে থাকেন না। একটা ঘর, সেখানে ছেলে আর ছেলের বউ দিনরাত অশান্তি করে। উনি সারাদিন রিক্সা চালান আর রাতে স্টেশনে থাকেন। এখন শহরে বন্যা আসছে, তাই রিক্সা দিনকয়েকের জন্য মালিককে ফিরিয়ে দিয়ে অন্য শহরে চলেছেন কাজের খোঁজে। বললাম, ক’দিনের জন্যেও বাড়ি যাবেন না?

বললেন, একবার বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি আর ফিরব না। ওরাও আসতে বলে নি, তুমিও এভাবে ঘুরে ঘুরে বেড়িও না বিপদের সময়।

 

ট্রেন ধরা হল না। স্টেশনের সামনেই পেয়ে গেলাম বাস, এবার গন্তব্য চেনা।

 

***********

“আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছি”, এর মধ্যে একটা রোমান্টিক ভাব আছে। তবে সত্যিটা হল – বাড়ি থেকে চলে যাওয়া সবার কম্ম নয়, বরং বাইরের বিপদ থেকে বাড়িতেই পালিয়ে আসাই বেশিরভাগের ভবিতব্য।

তারপর গন্তব্য প্রচুর বদলেছে। একটা করে বর্ষা যায় আর জলভরা মেঘের দিকে তাকিয়ে ভাবি ,হয়ত গন্তব্যই পরিবর্তনশীল। পথই ধ্রুব। তবে, দশক তিনেক আগের আবিষ্কৃত সত্যিটার সঙ্গে বোঝাপড়া চলছেই।

https://bit.ly/3umuLl2

 

Summary
যেতে যেতে ১৫ : বাসের দুই দরজা
Article Name
যেতে যেতে ১৫ : বাসের দুই দরজা
Author
১ comment
  • Sruti Maitra জুলাই ১৭, ২০২১ at ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ

    আমি তো রোজই নবদ্বীপ যাই। কিন্তু সে যাওয়াটা তোর মত এত রোমান্টিক মানসিকতায় হয়না। কোন দিন কোন কাজের দায়িত্ব আছে আর সেগুলো কিভাবে তুলব এই চিন্তাই মাথার মধ্যে ঘুর ঘুর করে যাওয়ার সময়। নবদ্বীপের বন্যা নিয়ে বেশ কিছু অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। তোর লেখাটা পড়ে খুব ভালো লাগলো আর অনুপ্রাণিতও হলাম। ভুলে যাওয়ার আগে সেগুলো লিখে ফেলতে হবে…

Leave a Reply

Solve : *
34 ⁄ 17 =