স্বপ্ন দেখার গল্প, আমার তিনটি স্বপ্ন-যা স্বপ্ন হলেও গল্প মনে হয়

স্বপ্ন দেখার গল্প

স্বপ্ন দেখার গল্প, আমার তিনটি স্বপ্ন-যা স্বপ্ন হলেও গল্প মনে হয়

স্বপ্ন দেখার গল্প, আমার তিনটি স্বপ্ন-যা স্বপ্ন হলেও গল্প মনে হয় 1024 1024 সীমানা ছাড়িয়ে

স্বপ্ন দেখার গল্প

আজকের বিষয় স্বপ্ন। আজ আমার অন্য আরো কিছু বন্ধুর সঙ্গে স্বপ্ন দেখার গল্প নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেই প্রসঙ্গেই আজ আমার দেখা তিনটি স্বপ্ন দেখার গল্প শোনাই।

প্রথম গল্প, স্বপ্ন দেখার গল্প

**********************

আমার দেখা স্বপ্নগুলির মধ্যে এটাই সবচেয়ে প্রিয়।তাই আগে এটাই শোনাই।সকালবেলা সাইকেলের দু’পাশে দু’টো রেশনের ব্যাগ নিয়ে চলেছি বাজারে। বাজারে যাওয়ার পথে হঠাৎ আমার সাইকেল কৃষ্ণনগরের রাস্তা ছেড়ে চলতে লাগল শান্তিনিকেতনের রাস্তায়! অমর্ত্য সেনের বাড়ি ডানদিকে রেখে, সামনে দিয়ে সাইকেল নিয়ে চলেছি। একটু পরেই বাঁদিকে রবীন্দ্রনাথের ‘উদয়ন’ বাড়ি পড়ল।

গুরুদেবের সঙ্গে দেখা

‘উদয়ন’ বাড়ির সামনে দিয়ে পেরোনোর সময় দেখলাম রবীন্দ্রনাথ বসে সকালবেলা, জোব্বা পরে, গম্ভীর হয়ে বসেছিলেন। থুতনিতে হাত রাখা ছিল, দৃষ্টি সামনের টেবিলে নিবদ্ধ। সাইকেল আস্তে করে, ডান হাত উপরে তুলে চলন্ত অবস্থায় প্রশ্ন করলাম, গুরুদেব সব ভালো তো?

গুরুদেব আমাকে দেখে দুগ্ধ ফেননিভ দাড়ি নিয়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়লেন। উনিও হাত তুলে আমাকে বললেন, আরে দেবাঞ্জন যে! এদিকে একটু এস তো।

আমি কবিগুরুর বাড়ির বেড়ায় আমার সাইকেলটি হেলান দিয়ে রাখলাম। তারপর তালা মেরে, সিঁড়িতে জুতো খুলে, আস্তে আস্তে উদয়ন বাড়ির বারান্দায় প্রবেশ করলাম।

উদয়নের বারান্দায় গুরুদেব আর আমি

কবিগুরু বললেন, আজ ভোরবেলা উঠে একটা কবিতা লিখেছি। কবিতাটা কেমন হয়েছে শোনানোর জন্য প্রমথনাথ বিশীকে ডেকে ছিলাম। সে তো এখনও আসেনি, তা তুমি একটুখানি শুনবে নাকি?

আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম, হ্যাঁ গুরুদেব শুনব বৈকি! অবশ্যই শুনব।

তারপরেই কবিগুরু নিজের কন্ঠে আবৃত্তি শুরু করলেন –

“আজি এ প্রভাতে রবির কর

কেমনে পশিল প্রাণের পর…..”

শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর বাড়ির বাগানে ওদিকে পাখি ডাকছে, আমার পিঠে নরম রোদ। সামনে রাখা লুচির প্লেট, ওদিকে কবিগুরুর কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। সে এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা! শান্তিনিকেতনের ‘কী অনির্বচনীয় মহিমা’!

দিব্যি চলছিল। সমস্যাটা হল, যখন কবিগুরুর কন্ঠ স্পর্শ করল সেই লাইনগুলি –

“ওরে চারিদিকে মোর

এ কী কারাগার ঘোর

ভাঙ ভাঙ ভাঙ কারা

আঘাতে আঘাত কর..”

কারার আঘাতে আমার স্বপ্নভঙ্গ

এই সময়েই, সেই কারার আঘাত দেখলাম মৃদু ঝাঁকুনিতে পরিণত হয়েছে। আমাকে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে মা ডাকছেন। বলছেন, যথেষ্ট বেলা হয়েছে। এবার বাজারে যেতে হবে।

নির্ঝরের স্বপ্ন যেন ঝর ঝর করে সশব্দেই আমার জীবনে ভঙ্গ হল!

সেদিন অমন হাতে গরম কবিতা আধা-খাপচা শুনে চলে যেতে হল। কোনদিন অভিমানী কবিগুরুও আর এক মিনিটের জন্য আমার স্বপ্নে ফিরে আসেননি, তা বলাই বাহুল্য। সকালে উঠে মন খারাপ করে বহুক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম।

দ্বিতীয় গল্প, স্বপ্ন দেখার গল্প

**********************

স্বপ্ন দেখার পরের গল্প তুলনামূলক কম বিখ্যাত, এক মানুষকে নিয়ে। শুনে পাঠক আমার চপলমতি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু আমার প্রিয়।স্বপ্ন দেখার পরের গল্প সি ভি রামনকে নিয়ে নয়। ‘ভারতীয় নোবেল শিকারী’ হিসাবে ওঁর কথা আসা উচিত ছিল। তবে ভদ্রলোকের স্বপ্নে হাজিরা দেওয়ায় সম্ভবত প্রবল অনীহা আছে। তাই আমার স্বপ্নের রঙ ‘Blue’ নয়, বলা যায় রামন এফেক্ট মুক্ত।

স্বপ্নগ্ৰাফি

তা, সে এক শীত শেষের সন্ধে। বসন্তের সেই প্রাণ ভোলানো হাওয়া দিচ্ছে যাতে গাছের পাতাগুলো সরসর করে ঝরে যায়।

ইউনিভার্সিটির গেটে অপেক্ষয়মান প্রীতি জিন্টা

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইভনিং ক্লাসের পর, বেরিয়ে দেখি কোন বন্ধু আজ হাতে সিগারেট নিয়ে বিরসবদনে দাঁড়িয়ে নেই। বরং গেটের সামনে দাঁড়িয়ে নায়িকা প্রীতি জিন্টা! ডান হাতে করে কিছু বইপত্র বুকের কাছে জড়ো করে রাখা। চশমাটি মাথায় হেয়ার ব্যান্ড এর মতন করে তোলা, এসেছে একটি হলুদ টি শার্ট আর নীল জিন্স পরে। চোখাচোখি হতেই সেই তার পরিচিত ভুবনমোহিনী হাসি হেসে বলল, আরে দেবাঞ্জন! তোর কি খবর? অনেকদিন দেখা নেই! চল আজকে একটু গল্প হোক কলেজ স্কোয়ারে বসে।

সুপ নয় ফুচকা

খানিক গল্পও হল YMCA Canteen থেকে সুপ খেতে খেতে। তারপর আমি প্রস্তাব দিলাম, তুই নায়িকা হওয়ার পর অনেকদিন একসঙ্গে ফুচকা খাওয়া হয়নি। চল ফুচকা খাওয়া যাক। আজ কিন্ত তোকে আমি খাওয়াব।

তখন দশ টাকায় সম্ভবত বারোটি ফুচকা হত। প্রীতি নায়িকা হলেও খুবই ভাল মেয়ে। খান তিরিশ, চল্লিশ ফুচকা অনায়াসে খেয়ে নিল। এর পরেই হঠাৎ কি মরতে যেন কোথা থেকে একটি S16 বাস কলেজ স্ট্রিটে ইউনিভার্সিটির সামনে চলে এল। বা বলা উচিত “একটা বাস হুম করে লাফিয়ে পড়ল”।

ফুচকার পাতা আর আমার একই পরিণতি

প্রীতি বাসটি দেখেই বলল, যে তার ভয়ানক তাড়া আছে বাসটি ধরার। তারপর ফুচকার পাতা রাস্তায় ফেলে, তৎক্ষণাৎ বাসে উঠে হাত নাড়তে নাড়তে চলে গেল।

ফুচকা খেতে খেতে আর ওর ভুবনমোহিনী হাসি দেখে, একটা কথা সেদিন ওকে বলার ইচ্ছা হয়েছিল। সে কথা প্রীতিকে এখনও কোন স্বপ্ন দেখার  সময়, জানানোর সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি।

তৃতীয় গল্প, স্বপ্ন দেখার গল্প

***********************

শেষ গল্পটি, অর্থাৎতৃতীয় স্বপ্নটি একটু অন্য ধরনের। নির্ভয়ে থাকুন। দ্বিতীয় স্বপ্ন দেখার গল্পে আমি কবিগুরু থেকে প্রীতি জিন্টায় এসে পৌছলেও, তৃতীয় স্বপ্নে কিছুতেই আমি কোন সীমা লংঘন করব না কথা দিলাম।

স্বপ্ন দেখার গল্পেরও পূর্বকথা

রবিবার সকালবেলা কফি খেতে খেতে কাগজের বিজ্ঞাপনে (যেভাবে শার্লক হোমস পড়তেন এবং আমি আদতে কোনদিনই পড়িনি) আবিষ্কার করলাম একটি বিচিত্র বিজ্ঞাপন। একটি পদে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে, এবং একটিই শূন্য পদ। প্রার্থীর কিছু অদ্ভুত যোগ্যতা চাওয়া হচ্ছে।

আমি যখন শার্লক

পৌঁছে গেলাম কৈখালী বা বাগুইআটির দিকের একটি ফ্ল্যাট বাড়ির তিন তলায়। দরজা খুললেন এক অশীতিপর বৃদ্ধ। লিভিং রুমে সোফায় বসে আছেন প্রায় একই বয়সের এক বৃদ্ধা। সারা ঘরের বিভিন্ন অংশে ওই দম্পতি এবং এক মাঝবয়সি মহিলার ছবি। সম্ভবত ওঁদেরই মেয়ের ছবি, কিছু কিছু জায়গায় সেই মহিলার একার ছবিও আছে। মাঝে মধ্যে একটা অদ্ভুত গন্ধ আসছে। কথাবার্তা কিছুদূর এগোনোর পর জানলাম, আমাকে প্রায়ই কিছু জিনিস কিনে কিনে এনে দিতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে কিছু কেমিক্যাল এবং ঔষধপত্র। এটাও আমার চাকরির অন্যতম কাজ হবে।

রহস্য উন্মোচন

একটু পর আমি নিজেকে আর সংবরণ করতে না পেরে ভদ্রলোককে বললাম, আচ্ছা আপনার একমাত্র কন্যা কি খুব রিসেন্টলি মারা গেছেন?ভদ্রলোক শুনে স্তম্ভিত হলেন তারপর আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে জানালেন যে, হ্যাঁ। ও আমাদের একমাত্র মেয়ে। যার অ্যাক্সিডেন্টে প্যারালাইসিস হয়েছিল। ও তিন বছর ভোগার পর দু’দিন আগে মারা গেছে।

আমি তাঁদের বললাম, আপনারা কন্যার মৃত্যু সংবাদ বাইরে কোথাও প্রকাশও করেননি তো? যা বুঝছি, আপনারা তার মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে চান, তাই তো?

ভদ্রলোক শুনে তাড়াতাড়ি করে বৃদ্ধাকে ভেতরের ঘরে রেখে এলেন।

স্বপ্ন দেখার গল্পে চাকুরিজীবী শার্লক কী বা করতে পারে!

তারপর আমাকে বললেন, আপনি অদ্ভুতভাবে ঠিকটাই ধরে ফেলেছেন! আপনি কিন্তু দয়া করে এটা কাউকে বলবেন না। আমি যোগ্য ব্যক্তিকে এমনিই অনেক টাকা মাইনের চাকরি দিতাম। আপনাকে অনুরোধ করছি এটা না বলতে। তার জন্য আমি আপনাকে আরো অনেক টাকাও দেব।

সবিনয় ভদ্রলোককে জানালাম যে আমিও আমি একটি চাকরি করি এবং উপস্থিত খুব বেশি টাকার প্রয়োজন আমার নেই। বিজ্ঞাপনটি দেখে নেহাত কৌতুহল নিবৃত্তির জন্যই আমি ওঁদের বাড়ি এসেছিলাম। যদি এই বিজ্ঞাপন থেকে আরো অন্য লোককে বাড়িতে আমার আগে প্রবেশ করতে দিয়ে থাকেন, তাহলে সেক্ষেত্রে আরো অন্য লোক হয়ত জেনে ফেলেছে। যে কেউই বুঝে যেতে পারে ওঁদের কথাবার্তায়। এ বিষয়ে পদে পদে সাবধান থাকা উচিত।

ওঁরা যা করতে চলেছেন তারা তো সভ্যতা খুব স্বাভাবিক ভাবে নেয় না। জানলেই কাল সকালে ‘হিচককের সাইকো’ বলে চ্যানলে চ্যনেলে ব্রেকিং নিউজ আসবে। এই বয়সে এতে ওঁদের আরো বিপদ হতে পারে।

শার্লক নয় নিজের বিশ্লেষণ

বেরিয়ে স্টিয়ারিংয়ে বসে ভাবছিলাম, এই জীবন্ত বৃদ্ধ দম্পতির কথা। কত বৃদ্ধ দম্পতিই আছেন এমন, সন্তান থেকেও নেই। হয় পরিবার থেকে আলাদা নয় Market Economy মেরে ফেলেছে তার মনুষ্যত্ব। এক মরা সন্তানের মৃতদেহ আগলে আছেন এক দম্পতি এই প্রাণহীন শহরে। হয়ত এই মৃতদেহ অনেক মানুষের চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত! কি করা যায় এই পরিবারের জন্য, সেই চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়লাম।

আমার এই স্বপ্ন দেখার গল্পের কোন ব্যাখ্যা থাকলে কেউ জানাবেন।

প্রথমত, ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি স্বপ্ন কোন দোষেই দুষ্ট হয় না। যদি হয়, তবে সগর্বে বলি, আমি স্বপ্ন-দোষে দুষ্ট। প্রতি রাতেই নানান রকম স্বপ্ন আমায় রাত্রিবেলা দেখা দিয়ে যায়। যার কিছু স্বপ্ন সুন্দর, কিছু দুঃস্বপ্ন, কিছু ‘সু’ এবং ‘দু’ এই দুই থেকেই থেকে সুদূরে। নিজের দেখা স্বপ্নগুলো আমি ফ্রয়েড বা ইয়ংয়ের তত্ত্বের সঙ্গে মেলাতেও পারিনা। সেসব ব্যাখ্যা জানতে চাইলে এই লিংক দেখতেই পারেন- https://bn.wikipedia.org/wiki/স্বপ্ন

দ্বিতীয়ত,ওঁদের উচ্চারিত গালভরা শব্দগুলি, যেমন – অচেতন মনের ইচ্ছাপুরণ ইত্যাদি নিয়ে আমার জ্ঞানলাভের মেধাও নেই। সেই জ্ঞান অর্জনের সময় দিন-বদলের অলস দিবাস্বপ্নেই কেটে যায়। দিবাস্বপ্নকে একটি  আলস্য ও কর্মবিমুখতার প্রতীক বলে মনে করা হয়।

সবশেষে , আমার মনে হয় স্বপ্ন কিছু মানুষের কাছে বাঁচার এক প্রেরণা।

দৃষ্টিকোণ বিভাগের অন্য লেখাগুলি পাবেন এই লিংকে – http://debanjanbagchi.com/category/গদ্য/দৃষ্টিকোন/

দেবাঞ্জন বাগচী।

 

 

Summary
স্বপ্ন দেখার গল্প, আমার তিনটি স্বপ্ন-যা স্বপ্ন হলেও গল্প মনে হয়
Article Name
স্বপ্ন দেখার গল্প, আমার তিনটি স্বপ্ন-যা স্বপ্ন হলেও গল্প মনে হয়
Description
আজকের বিষয় স্বপ্ন। আজ আমার অন্য আরো কিছু বন্ধুর সঙ্গে স্বপ্ন দেখার গল্প নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেই প্রসঙ্গেই আজ আমার দেখা তিনটি স্বপ্ন দেখার গল্প শোনাই।
Author
১ comment

Leave a Reply

Solve : *
23 − 15 =